আল্লাহপাক কখন কিভাবে শাস্তি দেন!

মহান আল্লাহপাক প্রত্যেক খারাপ কাজের জন্য অবশ্যই শাস্তি প্রদান করবেন এবং প্রতিটি ভাল কাজের জন্যও রয়েছে অশেষ নেকি। তবে কখন কিভাবে আল্লাহপাক শাস্তি দিবেন সেই কথাও কিন্তু কোরআনের আলোকে জানা যায়। সাধারণত গুনাহের শাস্তি তিনভাবে ভোগ করে মানুষ।১) ১ম প্রকারের শাস্তিকে বলা হয়, নাক্বীর অর্থাৎ নগদ শাস্তি। যেখানে গুনাহ করেছে সাথে সাথে কোন না কোন সমস্যা সৃষ্টি হয়ে যায় সেখানে। যেমন- অনেকেই নিজ মুখে স্বীকার করে যে, অই খারাপ কাজটা করার সাথে সাথেই আমি বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, আমার এই এই ক্ষতি হয়েছে, চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই ঝামেলা হয়ে গেছে ইত্যাদি। হযরত ফুজাইল বিন আয়াজ (রহঃ) বলেছেন, আমি যখনই আল্লাহ তায়ালার কোন নাফরমানি করেছি, আমি সেই নাফরমানির আছর (এখানে আছর মানে প্রভাব/ফলাফল) আমার স্ত্রীর মাঝে, আমার সন্তানদের মাঝে, আমার কর্মচারীদের মাঝে অথবা আমার সাওয়ারীর জানোয়ারের মধ্যে কোথাও না কোথাও অবশ্যই দেখেছি। যখনই আমি আমার আল্লাহর নাফরমানি করেছি, তখন আমার অধীনস্থ কেউ না কেউ আমার নাফরমানি করেছে। সুতরাং আসুন আমরা চিন্তা করে দেখি, আমার স্বামী যে আমার কথা শুনছে না, আমাকে ভালবাসছে না, তাহলে আমার দ্বারা আল্লাহ তায়ালার কোন নাফরমানি হয়ে যায়নি তো আবার? আমি কোন গুনাহে লিপ্ত নইতো আবার? যেটার নগদ শাস্তি আমি পেয়ে যাচ্ছি। আজ আমার সন্তান যে আমার নাফরমান হয়ে গেছে, হয়ত আমি যে আল্লাহর তায়ালার নাফরমানি করেছি তার বদলায় আমার সন্তান আমার নাফরমান হয়ে গেছে। কর্মচারী কাজের মধ্যে যে ধোকা দিয়ে যাচ্ছে, তা নগদ সাজা নয়তো? এই ধরণের নগদ শাস্তিকে বলে নাক্বীর।২) ২য় প্রকারের শাস্তিকে বলা হয়, তা’খীর বা বিলম্বিত শাস্তি। যেটা গুনাহ করার অনেকদিন পরে:- এক সপ্তাহ, একমাস, একবছর বা বহুবছর পরেও আসতে পারে। এবং এই শাস্তিটা প্রথম শাস্তির চেয়ে বেশি পরিমাণে বেশি হয়ে থাকে। যেমন, পাপ করেছে যৌবনকালে আর শাস্তি পাচ্ছে বৃদ্ধাকালে। হতে পারে শরীরে যখন খুব শক্তি ছিলো, চেয়াহার রুপ-লাবণ্য ছিলো তখন গুনাহ করেছে, আর শাস্তি পাচ্ছে যখন শরীর দুর্বল হয়ে গেছে। চেহারার চামড়ায় ভাজ পড়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে নিরুপায় হয়ে বিছানায় পড়ে শাস্তি ভোগ করছে। ফেসবুকে একসময় অনেক ছবি আপলোড দিতো! আর এখন চেহারা এতটাই নষ্ট হয়ে গেছে যে, সবার থেকে লুকানোর চেষ্টা করে শুধু। বিয়ে করেছে তিন চার বছর প্রেম করে অথবা ওয়েডিং ফটোগ্রাফি করে। আর সংসারে অশান্তি শুরু হয়েছে বিয়ের পাঁচ/সাত বছর পরে! এটা যে আগের পাপের শাস্তি সেটাই বুঝতে পারে না অনেকে! অথচ সারাদিন বসে বসে ভাবে, আমার রোমান্টিক প্রেমিক পুরুষটা হঠাৎ এমন হয়ে গেলো কেন?! এই অবস্থায় কেউ চায় আমল, আর কেউ কেউ আরো বড় গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায়! কেউ আবার কোন সাধু বাবার কাছে গিয়ে বলে,
“”বাবা, একখান তাবিজ দেন স্বামীকে বশ করার””আবার এমনও হতে পারে যে, বিয়ের সময়ে করা কোন গুনাহের কারণে আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হয়ে আপনাকে কখনো সন্তানের মুখ দেখাবেন না! যেকোনভাবেই আল্লাহ তায়ালা শাস্তি দিতে পারেন।মনে রাখা জরুরী, এক গুনাহ আরেক গুনাহের দিকে নিয়ে যায়! আর গুনাহের আধিক্যতা কখনো কখনো মানুষকে ঈমানহারা করে বেঈমান বানিয়ে কবরে নিয়ে যায়!অনর্থক ও অপ্রয়োজনে ছবি তোলা জায়েজ নাই। ফেসবুকে ছবি দিচ্ছেন মানে প্রায় চব্বিশ ঘন্টা আপনি গুনাহে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছেন!এখন তো অনেকেই ফেসবুকে অনেক ছেলের সাথে চ্যাটিং আর গোপণে ডেটিং করে বেড়ায়! এর ভয়াবহ পরিণতি কতটা ভয়াবহ!এক হাদীসে আসছে:-
“”যে ব্যক্তি কোন মহিলাকে কুমতলবের ইচ্ছা নিয়ে স্পর্শ করবে, কিয়ামতের দিন সে এমনভাবে আসবে যে তার হাত তার ঘাড়ের সাথে যুক্ত থাকবে। সে যদি এ নারীকে চুমু দিয়ে থাকে, তাহলে তার ঠোঁট দুটিকে আগুনের কাঁচি দিয়ে কেঁটে ফেলা হবে। আর যদি তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে থাকে তাহলে তার দুই উরু সাক্ষী দিবে, আমি অবৈধ কাজের জন্য আরোহণ করেছিলাম। তখন আল্লাহ তার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকাবেন এবং এতে সে অপমান বোধ করে গোয়ার্তুমি করে বলবে ; আমি এ কাজ করিনি। তখন তার জিহ্বা তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়ে বলবে, ‘আমি অবৈধ বিষয়ে কথা বলেছিলাম’। তার হাত সাক্ষী দিবে, ‘আমি অবৈধ বস্তু ধরেছিলাম’। এরপর চক্ষু বলবে, ‘ আমি অবৈধ বস্তুর দিকে তাকাতাম’। তার দুখানা পা বলবে, ‘ আমি ব্যভিচার করেছি’। প্রহরী ফেরেশতারা বলবে, ‘ আমি শুনেছি’। অন্য ফেরেশতা বলবে, ‘আর আমি লিখে রেখেছি’। আর আল্লাহ বলবেন, ‘আমি জেনেছি এবং লুকিয়ে রেখেছি’। এরপর আল্লাহ বলবেন, ‘হে ফেরেশতাগণ! একে পাকড়াও করে আমার আযাব ভোগ করাও। কেননা যে ব্যক্তির লজ্জা কমে যায় তার উপর আমার ক্রোধের অন্ত নাই””আরেক হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “হে মুসলমানগণ ! তোমরা ব্যভিচার পরিত্যাগ কর। কেননা এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। মন্দ পরিণতি এর মধ্যে তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে। যে তিনটি শাস্তি দুনিয়াতে হয় তা হচ্ছে, তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য বিনষ্ট হয়ে যাবে, তার আয়ুষ্কাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে এবং তার দারিদ্রতা চিরস্থায়ী হবে। আর যে তিনটি শাস্তি আখেরাতে প্রকাশ পাবে তা হচ্ছে, সে আল্লাহর অসন্তোষ, কঠিন হিসাব ও জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে”। [বায়হাকী]৩) ৩য় প্রকারের শাস্তিকে বলা হয়, খুফিয়া তাদবীর বা গোপন শাস্তি। এটা ২য় প্রকারের চেয়ে ভয়াবহ ও কঠিন শাস্তি। বিভিন্ন প্রকারের বিপদাপদ বা অশান্তিতে ভুগবেন,কিন্তু বুঝতেও পারবেন না কেন এমন হচ্ছে! এমনও হতে যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,
فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِۦ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوٰبَ كُلِّ شَىْءٍ حَتّٰىٓ إِذَا فَرِحُوا بِمَآ أُوتُوٓا أَخَذْنٰهُم بَغْتَةً فَإِذَا هُم مُّبْلِسُونَ
অর্থ:- অতঃপর তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল, তারা যখন তা ভুলে গেল, আমি তাদের উপর সব কিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে যখন তাদেরকে যা প্রদান করা হয়েছিল তার কারণে তারা উৎফুল্ল হল, আমি হঠাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম। ফলে তখন তারা হতাশ হয়ে গেল।ব্যাখ্যা:- আয়াতে বলা হয়েছে যে, গুনাহগারদের অবাধ্যতা যখন সীমাতিক্রম করতে থাকে, তখন তাদেরকে একটি বিপজ্জনক পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়। অর্থাৎ তাদের জন্য দুনিয়ার নেয়ামত, সুখ ও সাফল্যের সমস্ত দরজা খুলে দেয়া হয়। এতে সাধারণ মানুষকে হুশিয়ার করা হয়েছে যে, দুনিয়াতে কোন ব্যক্তি অথবা সম্প্রদায়ের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও সম্পদের প্রাচুর্য দেখে ধোকা খেয়ো না যে, তারাই বুঝি বিশুদ্ধ পথে আছে এবং সফল জীবন যাপন করছে। অনেক সময় আযাবে পতিত অবাধ্য জাতিসমূহেরও এরূপ অবস্থা হয়ে থাকে। তাদের ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্ত এই যে, তাদেরকে অকস্মাৎ কঠোর আযাবের মাধ্যমে পাকড়াও করা হবে। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমরা দেখ যে, কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তা’আলা দুনিয়ার ধন-দৌলত প্রদান করছেন, অথচ সে গোনাহ ও অবাধ্যতায় অটল, তখন বুঝে নেবে, তাকে ঢিল দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ তার এ ভোগ-বিলাস কঠোর আযাবে গ্রেফতার হওয়ারই পূর্বাভাস।[মুসনাদে আহমাদঃ ৪/১৪৫]আরেক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَ مَاۤ اَصَابَکُمۡ مِّنۡ مُّصِیۡبَۃٍ فَبِمَا کَسَبَتۡ اَیۡدِیۡکُمۡ وَ یَعۡفُوۡا عَنۡ کَثِیۡرٍ ﴿ؕ۳۰﴾
অর্থ:- তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গোনাহ ক্ষমা করে দেন।আরেকটি হাদীস:-সাওবান (রা:) থেকে বর্ণিত: নবী সল্লাল্লহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আমি আমার উম্মতের কিছু দল সম্পর্কে নিশ্চিত জানি যারা কিয়ামতের দিন তিহামার শুভ্র পর্বতমালার সমতুল্য নেক আমল সহ উপস্থিত হবে। মহামহিম আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। সাওবান (রা:) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে আমাদের নিকট বর্ণনা করুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তিনি বলেন: তারা তোমাদেরই ভ্রাতৃগোষ্ঠী এবং তোমাদের সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতই ইবাদত করবে। কিন্তু তারা এমন লোক যে, একান্ত গোপনে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত হবে।(সুনানে ইবনে মাযাহ ৪২৪৫)আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সব ধরণের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুণ, আমীন।

মতামত

comments

Post Author: admin