অনেকেই তো শখ করে ছবি ‍তুলেন জানেন কী ক্যামেরার ইতিহাস এবং ধারাবাহিক বিবর্তন।

মধুর স্মৃতিগুলো জমা রাখতে ক্যামেরার প্রয়োজন কতটা, সেটা বোধ করি নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। অধরা সময়কে ধরে রাখতে কিংবা স্মৃতির পাতা আওড়াতে, নিরাপত্তার প্রয়োজনে কিংবা ঘটনার সাক্ষী হিসেবে, পেশা কিংবা শখ মেটাতে ক্যামেরার সাথে তুলনীয় আর কিছু নেই।

ক্যামেরার সামনে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছবি তুলতে পছন্দ করেন অনেকেই। কেউবা আবার ক্যামেরার আড়ালেই নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। আবার কেউ একা একা কিংবা পছন্দের মানুষ বা বস্তুটির সাথে সেলফি তুলতে ব্যস্ত থাকেন। ক্যামেরায় ছবি তুলুক বা না তুলুক, ক্যামেরা ভালোবাসে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু এখন ক্যামেরা যতটা সহজলভ্য, আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর বা তার আগে ক্যামেরার কথা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতো না। ক্যামেরা আবিষ্কার যেমন রাতারাতি হয়নি, তেমনি বর্তমান সময়ের মতো আধুনিক ক্যামেরা পেতে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ। সর্বপ্রথম ক্যামেরা আবিষ্কার থেকে শুরু করে আজকের দিনের মুঠোফোনের ক্যামেরা পর্যন্ত ক্যামেরার বিবর্তনের ইতিহাস নিয়েই আজকের লেখা।

শুরুর আগে

শুরুর আগে ক্যামেরার কিছু দিক জেনে নেওয়া যাক। ক্যামেরা শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘কামারা’ (kamara) থেকে, যার অর্থ করলে দাঁড়ায় খিলানযুক্ত কুঠরি। এটি সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল ১৭০৮ সালে। ক্যামেরার বদৌলতে জন্ম হয়েছে ফটোগ্রাফির। ফটোগ্রাফি শব্দটিও এসেছে গ্রিক দুটি শব্দ থেকে- fos অর্থ লাইট বা আলো আর grafo অর্থ আঁকানো। ১৮৩৯ সালে স্যার জন এফ. ডব্লিউ. হার্সেল প্রথম ব্যবহার করেন শব্দটি।

ক্যামেরার খেলা হলো আলো নিয়ে আর তাই বস্তু থেকে থেকে আসা আলোকে প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ ছবি পাওয়া যায়। আলোর উজ্জ্বলতার তারতম্য তাই ছবির ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ফটোগ্রাফির ভাষায় যাকে বলে এক্সপোজার।

ধারণার শুরুর পর থেকে ধারাবাহিক বিবর্তন

ক্যামেরা অবস্কিউরার মাধ্যমে ক্যামেরার নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। ল্যাটিন শব্দ ‘ক্যামেরা অবস্কিউরার’ অর্থ হলো অন্ধকার ঘর। একে অনেকে আবার পিনহোল ক্যামেরাও বলে থাকেন। ক্যামেরা অবস্কিউরার মূলনীতি ছিল, এটি একটি অন্ধকার ঘর হবে যার এক দেয়ালে থাকবে একটি লেন্সযুক্ত ছোট্ট ছিদ্র, আর আলো বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে সেই ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করবে এবং দেয়ালের অপরপ্রান্তে গিয়ে প্রতিবিম্ব গঠন করবে, কিন্তু উল্টোভাবে। এটিই ক্যামেরা অবস্কিউরা। এর মাধ্যমে ক্যামেরার ইতিহাস রচনা শুরু হয়, আর ফলাফল আজকের অত্যাধুনিক ক্যামেরা।

আরব বিজ্ঞানী ইবনে আল হাইথাম বা আল হাজেন ১০২১ খ্রিস্টাব্দে আলোক বিজ্ঞান নিয়ে প্রকাশ করেন তার বই ‘কিতাব আল মানাযির’, যা পরবর্তী সময়ে আলোক বিজ্ঞানের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এই বইয়ে সর্বপ্রথম তিনি ক্যামেরা অবস্কিউরার ধারণা উল্লেখ করেন। তাই তাকেই ক্যামেরা অবস্কিউরার অগ্রদূত ধরা হয়। কিন্তু এর আগেও চীনা দার্শনিক মোজির আনুমানিক ৪০০ খ্রিষ্টপূর্বের লেখা এবং এরিস্টটলের প্রায় ৩৩০ খ্রিষ্টপূর্বের লেখায় ক্যামেরা অবস্কিউরার আংশিক ধারণা পাওয়া যায়।

সেই সময় এটি ব্যবহার করা হয়েছিল সূর্যগ্রহণ দেখার কাজে, আর এই কাজটি করেছিলেন লিউভেন ইউনিভার্সিটিতে রাইনার জেমা ফ্রিসিয়াস, ১৫৪৪ সালে। ক্যামেরা অবস্কিউরা ব্যবহার করে হাতে আঁকিয়ে ছবি সংরক্ষণ করতে হতো।

প্রথম ছবি সংরক্ষণ

ক্যামেরা অবস্কিউরা ছিল অনেকটা প্রজেক্টরের মতো, যার কারণে কোনো ছবি হাতে আঁকা ছাড়া সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিল না। এটি ছিল বেশ কঠিন, কারণ প্রতিফলিত ছবি সংরক্ষণ করার পদ্ধতি সে সময় কারো মাথায় আসেনি। কিন্তু ১৭২৭ সালে জার্মান পদার্থবিদ জোহান স্কালজ আলোক সংবেদনশীল রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে কাজ করেন এবং প্রমাণ করেন যে, সিলভার লবণ আলোক সংবেদনশীল। কিন্তু তার এই আবিষ্কারকে তিনি ছবি সংরক্ষণের কাজে লাগাতে পারেননি, যার ফলে সংরক্ষণের উপায় আবিষ্কার হতে অপেক্ষা করতে হয়েছিলো আরো ১০০ বছর। ১৮২৭ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী জোসেফ নিসেফোর নিপ্স ক্যামেরা অবস্কিউরা ব্যবহার করে ইতিহাসে প্রথম ছবি সংরক্ষণের কৃতিত্ব অর্জন করেন।

তিনি ক্যামেরা অবস্কিউরায় একটা নকশা করা বিটুমিন আবৃত মেটাল প্লেট বসিয়ে দেন। এতে বস্তু থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে প্লেটের উপরে যে অংশে পড়ে সে অংশে বিক্রিয়া হয়, আর বাকিটা থেকে যায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। এরপর সেটিকে একটি রাসায়নিক দ্রবণে ধোয়ার পর সাদা-কালো একটি ছবি পাওয়া যেত। কিন্তু একটি ছবি পেতে অপেক্ষা করতে হতো অনেকটা সময়। এটি সূর্যের আলোতে এক্সপোজ হতে সময় নিত ৮ ঘণ্টা বা তারো বেশি এবং খুব তাড়াতাড়ি ম্লান হয়ে যেত।

মতামত

comments

Post Author: admin