চেষ্টা সংগ্রামেই জীবনের সাফল্য? কেন বলেছে ইসলাম। আজই জেনে নিন।

চেষ্টা-সাধনা ছাড়া মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারে না। ভালো কিছু উপহার দিতে পারে না পৃথিবী ও পৃথিবীর সন্তানদের। পৃথিবীতে রেখে যেতে পারে না সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল ও প্রশংসনীয় কর্ম। মৃত্যুর পরে অমর থাকা, মানুষের হৃদয় মিনারে বেঁচে থাকা, সমাদৃত ও বরণীয় হয়ে অন্তরে অন্তরে ধ্বনি তোলার জন্য প্রয়োজন চেষ্টা-সাধনা এবং সংগ্রাম। এর সঙ্গে সঙ্গে মনের জমিনে ফলাতে হবে দুর্দম-দুরন্ত স্পৃহার ফসল। রক্তকণিকায় বাজাতে হবে শুদ্ধ সুরের বাঁশি। দেহের পেশিতে জাগাতে হবে নির্মাণের আলোকদীপ্ত স্বপ্ন ও বিশ্বাস।
চেষ্টা-সাধনার অপর নাম সফলতা। চেষ্টা-সাধনা ছাড়া সফলতা কল্পনা করা নিছক মূর্খতা। পৃথিবীর ইতিহাসে যাদের নাম সমাদৃত, মানুষের মুখে মুখে প্রশংসায় উচ্চারিত, স্বপ্নবাজদের হৃদয় টেবিলের আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয়, যারা উপমা হয়ে জ্বলছে আলোর আকাশে, তারা সবাই চেষ্টা-সাধনায় ব্রত নিয়েছিলেন। স্বপ্ন নির্মাণে চেষ্টা-সাধনাকে চূড়ান্ত করে নিয়েছিলেন জীবনের জন্য।
বান্দার একান্ত চেষ্টা-সংগ্রামের কাছে আল্লাহ খুলে দেবেন রহমতের ভা-ার। এটা মহান খোদার প্রতিশ্রুতি। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আমার জন্য চেষ্টা-সংগ্রাম করবে তাদের আমি আমার পথ দেখাব। আর নিশ্চিত আল্লাহ সৎকর্মশীল লোকদের সঙ্গে রয়েছেন।’ (সূরা আনকাবুত : ৬৯)। ভারতের পরমাণু বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম বলেছেন, ‘সূর্যের মতো দীপ্তিমান হতে হলে প্রথমে তোমাকে সূর্যের মতোই পুড়তে হবে।’ যে স্বপ্ন দেখে উজ্জ্বলতার, ভব্যতার, মরে গিয়ে বেঁচে থাকার, তাকে জলাঞ্জলি দিতে হবে জীবনের কাছে জীবনকে, ইচ্ছার কাছে ইচ্ছাকে। নিজেকে সোপর্দ করে দিতে হবে লক্ষ্যের পেছনে। পৃথিবী শহরের সব পিছুটানকে উপেক্ষা করে জীবনকে নিবেদিত করতে হবে লক্ষ্যের জন্য। আরাধনায় দিনরাত নিমজ্জিত থাকতে হবে। সূর্যাস্ত, সূর্যোদয়ের হিসাব থাকবে না জীবনের ডায়েরিতে। জীবন হতে হবে গল্পের ভেতরের গল্প।
আল্লাহ বান্দাকে শিক্ষা দিয়েছেন তাঁকে পাওয়ার পথ পদ্ধতি। বাতলে দিয়েছেন পন্থা। আল্লাহকে পেতে হলে, তাঁর সঙ্গে হৃদ্যতা গাঢ় করতে হলে তাঁর হুকুম পালনে ব্রত হতে হবে। তাঁর স্মরণে উৎসর্গ করতে হবে জীবন এবং জীবনের সবকিছু। উৎসর্গেই আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য। তাঁর প্রেমের ছোঁয়া। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার রবের নাম স্মরণ করতে থাক এবং সবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে একমাত্র তাঁরই দিকে মনোনিবেশ করো।’ (সূরা মুজ্জাম্মিল : ৮)।
স্বপ্ন পূরণে ইচ্ছাশক্তিকে শানিত করতে হবে বিশ্বাসের কষ্টি পাথরে। স্বপ্নের সঙ্গে ইচ্ছাশক্তি আর বিশ্বাস কাজ করলে স্বপ্নেরা জয়ী হবে আমাদের ফ্রেমে। আমাদের আকাশে ফুটবে দীপ্তিমান উজ্জ্বল তারা। আমাদের বিশ্বাসের সবটা দিয়ে, চেতনার মিনারে শাশ্বত চেতনা জাগ্রত করে তরী ভাসাতে হবে স্বপ্নের সাগরে। বিশ্বাস করতে হবে যে, কোনো উত্তাল তরঙ্গ, ঝড়-ঝাপটা আমার তরীকে তলিয়ে দিতে পারবে না। কোনো বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি আমার দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির তরীকে ডুবিয়ে দিতে পারবে না। কেননা বিশ্বাস মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বিশ্বাস বাঁচতে শেখায়। বাঁচাতে শেখায়। সুতরাং কাক্সিক্ষত স্বপ্ন পূরণে চেষ্টা-সাধনায় নিজেকে বিলীন করতে হবে। প্রাণের নবী মুহাম্মদ (সা.) তার সাথীদের শিক্ষা দিয়েছেন ইচ্ছাকে ব্যয় করার। স্বপ্নকে চেষ্টা-সাধনায় জয় করার। এ পাঠ মানুষের জীবনে, আমলে কাজে লাগাতে পারলে জীবন হবে পবিত্র আলোয় উদ্ভাসিত। হাদিসে এসেছে, আবু ফিরাস রাবি’আ ইবনে কা’ব আসলামি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলের খাদেম এবং আসহাবে সুফফার একজন ছিলেন। তিনি বলেন, আমি রাসুলের সঙ্গে রাতযাপন করতাম এবং তাকে অজুর পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দিতাম। তিনি আমাকে বলেন, আমার কাছে (তোমার যা ইচ্ছা) চাও। আমি বললাম, আমি জান্নাতে আপনার সঙ্গে থাকতে চাই।
তিনি বলেন, এছাড়া আরও কিছু? আমি বললাম, ওটাই চাই। তিনি বলেন, তুমি তোমার নিজের জন্য বেশি বেশি সিজদা (অর্থাৎ নামাজ) দ্বারা আমাকে সাহায্য করো। (মুসলিম : ৪৮৯)।
‘কষ্ট ছাড়া কেষ্ট মিলে না’ কথাটা অনেক প্রাচীন। কিন্তু কথাটা জিইয়ে আছে আজও। কথাটা সুগন্ধ ছড়াচ্ছে মানুষের জীবনের অলিগলিতে। সুতরাং কষ্টের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের ছুটে যেতে হবে উদ্দেশ্যের নগরে। জুলভার্ন বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ৮০ দিনে বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন। এ অল্প দিনে পুরো বিশ্ব ভ্রমণ এমনিতে হয়ে যায়নি। এজন্য তাকে নানা বিপদাপদ, বাধা পাড়ি দিতে হয়েছে। পৃথিবীর সব সফলতার পেছনে আছে যাতনার দীর্ঘ কাহিনী। জীবন বিপন্নতার নানা ‘মনভাঙা’ গল্প।
মানবতার ধর্ম ইসলামও বলেছে, চেষ্টা এবং কষ্টে রয়েছে সফলতা। মুসলমানের প্রধান স্বপ্ন হলো জান্নাত। আর জান্নাতকে দুঃখ-কষ্টের দ্বারা আড়াল করে রাখা হয়েছে। সুতরাং জান্নাতে যেতে চাইলে চেষ্টা-সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। রাতদিন পরিশ্রম করে যেতে হবে জান্নাতের উপরকণ সংগ্রহে। মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘দোজখকে লোভনীয় জিনিস দিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছে। আর জান্নাতকে দুঃখ-কষ্টের দ্বারা আড়ালে রাখা হয়েছে।’ (বোখারি ও মুসলিম সূত্রে রিয়াদুস সালেহীন : ১০১)।
মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনের পূর্বাপর সব গোনাহ মাফ হওয়া সত্ত্বেও তিনি দিবানিশি ইবাদত করতেন। প্রিয় প্রেমিক আল্লাহর সোহবতে ধন্য থেকে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন কষ্টের কাছে। হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘নবী (সা.) রাতে এত বেশি ইবাদত করতেন যে, তাতে এমনকি তাঁর পা মোবারক ফুলে ফেটে যেত। আমি তাঁকে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি এরূপ কেন? আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের সব ত্রুটিবিচ্যুতি তো আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন? তিনি বলেন, আমি কি আল্লাহর শোকরগুজার বান্দা হওয়া পছন্দ করব না।’ (বোখারি ও মুসলিম সূত্রে রিয়াদুস সালেহীন : ৯৮)।
আমাদের জীবনকে সুন্দর ও সাফল্যম-িত করতে হলে সময়কে কাজে লাগাতে হবে। জীবনকে উপলব্ধি করে তার কাছে থেকে সফলতার পাঠ নিতে হবে। সময় ও স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে করে জীবনকে পৌঁছে দিতে হবে সফলতার স্বর্ণ শিখরে। সময় এবং স্বাস্থ্য আমাদের অনুকূলে থাকার পরও যদি জীবন সুন্দর না হয়, স্বপ্ন পূরণ না হয়, তাহলে আমাদের বেঁচে থাকা নিরর্থক। সময় ও স্বাস্থ্য মানুষের বড় নেয়ামত। মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘দুইটি নেয়ামত (আল্লাহর দান) যার ব্যাপারে বহু লোক ক্ষতিগ্রস্তÑ স্বাস্থ্য ও অবসর।’ (বোখারি : ৬৪১২; তিরমিজি : ২৩০৪)।
আমরা যদি আল্লাহর কালাম, রাসুলের বাণী ও তাদের কাছ থেকে শুদ্ধতার পাঠ নিয়ে জীবনকে চেষ্টা-সংগ্রামে উৎসর্গ করতে পারি, তাহলে আমরাও পৃথিবীর উজ্জ্বল আকাশে দীপ্তিমান তারাদের পাশে নিজেদের নাম লেখাতে পারব।

মতামত

comments

Post Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *