হিন্দি সিনেমায় প্রেম: আগে ও পরে।

দিলীপ কুমারকে নিঃসন্দেহে হিন্দি সিনেমার প্রথম সুপারস্টার বলা যায়। ষাটের দশকে দিলীপ কুমারের কোনো ছবি মুক্তি পেলে দর্শক সেই ছবি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এমন খুব কমই ঘটেছে। সঙ্গে নায়িকার ভূমিকায় মীনা কুমারী, মধুবালা থাকলে তো কথাই নেই। দিলীপ কুমারের ছবিতে তার নায়িকারা হতো দর্শকের জন্য বোনাস! তারা পর্দায় তাদের প্রিয় নায়ককে দেখতে চাইতো যতটা না নায়ক হিসেবে তার চেয়ে বেশি প্রেমিক হিসেবে। কারণ সেই সময়ের প্রেম এমনই ছিল যা শুধু সিনেমাতেই সম্ভব। অথচ প্রেমিক দেরজন্য সেই সময়টা মোটেই সহজ ছিল না।

মহল্লার ছোট ভাইকে পটিয়ে অথবা আরেকটু সাহসী হয়ে জানালা দিয়ে প্রেমপত্র ছোড়াছুড়ির সময় তখন। রাস্তায় মেয়েরা ঘোমটা ছাড়া হাঁটলেই সর্বনাশ! ছেলেদের দিকে তাকানো তো রীতিমত নির্লজ্জতা! এসব অভিযোগ বাতাসের আগে বাসায় পৌঁছে যেত। এতো কিছুর পরও প্রেম চলত প্রেমের মতো। কারণ তারুণ্য এসব বাধা মানবে কেন? ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর পরিণাম হতো ভয়াবহ! সময়ের এমন পরিস্থিতির কারণেই তখনকার প্রেমের ট্র্যাজিক কাহিনিগুলো পর্দাতেও হৃদয়স্পর্শী হতো বাস্তবের মতোই। দিলীপ কুমার, রাজকাপুর, নার্গিস, রাজেশ খান্না যেন স্বর্গ থেকে এক টানে প্রেমকে নামিয়ে আনত সরাসরি রূপালী পর্দায়। তারা হাসলে দর্শক হাসত। কাঁদলে সেই দৃশ্য দর্শক ছলছল চোখে দেখত। নইলে ‘দিদার’ ছবির সেই দৃশ্য দেখে দর্শক বালতি বালতি চোখের জল ফেলবে কেন? যেখানে অন্ধ নায়ক পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আগেই পুনরায় নিজেকে অন্ধ করে ফেলছে। কারণ নায়ক দিলীপ কুমার ততদিনে জেনে গেছে নায়িকা তাকে ভালোবাসে না।অল্পবয়স্ক নলিনীর কথাই ধরুন। সিনেমাপাগল বোদ্ধা পাঠকের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। ‘শ্রীকান্ত’ ছবিতে দিলীপ কুমারের সঙ্গে নলিনীর ঝগড়ার এক পর্যায়ে দিলীপ কুমার যখন কলম দিয়ে তার কপালে আঘাত করে তখন সেখানে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। কিন্তু নলিনী ওই ক্ষতের ঘা খুটে খুটে আরো গভীর করার চেষ্টা করে যাতে প্রেমিকের দেয়া আঘাত সহজে মুছে না যায়। ভাবা যায়, ‘আহ’ সিনেমায় রাজ কাপুরের সেই নীরব প্রেমের কথা যা নার্গিসের প্রতি উৎসর্গীকৃত। বেচারা তিন ঘণ্টায় তার মনের কথা মুখ ফুটে বলতেই পারল না। কারণ রাজ কাপুর ছিল যক্ষারোগী।|

এরপর হিন্দি সিনেমায় প্রেম দেব আনন্দ, শাম্মী কাপুরদের কাঁধে চড়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। দেব আনন্দের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পর্দায় রোমান্স ফুটে ওঠে। আশা পারেখ, শর্মীলা ঠাকুর, মধুবালারা পর্দায় আরেকটু চঞ্চল হয়ে ওঠেন। তাদের চোখ ঘনঘন কেঁপে ওঠে। ঠোঁটে শুধু লাজুক হাসি নয়, দুষ্টুমির হাসিও দেখা যায়। অর্থাৎ প্রেম প্রকাশে নায়কদের পাশাপাশি তারাও পর্দায় সাহসী ভূমিকা রাখতে শুরু করে। দর্শক এই দৃশ্যগুলো লুফে নেয়। ‘দেবদাস’ ছবিতে সুচিত্রা সেন যখন অভিমানে আঙুল পুড়িয়ে ফেলে তখন দেবদাস ঘরে ঢুকেই জানতে চায়- ক্যায়সি হো পারু? সুনীল দত্ত ‘সুজানা’ ছবিতে ক্রন্দনরত নতুনকে টেলিফোনে গান শোনান। ‘বন্দিনী’তে নতুন অসুস্থ অশোক কুমারকে এক নজর দেখার জন্য ঘর থেকে পালিয়ে রাস্তায় নেমে দৌড়াতে শুরু করেন।
ঠিক এমন সময় রোমান্টিক নায়ক হিসেবে পর্দায় উপস্থিত হন রাজেশ খান্না। শর্মীলা ঠাকুরের উদ্দেশ্যে তার গাওয়া ‘মেরে স্বপ্নে কি রানী কব আয়েগি তু’ গানটি যেন পৃথিবীর তাবত প্রেমিকের মনের কথাই বলে দেয়। দর্শক এবার আরেকটু ভিন্নতার স্বাদ পায়। ঝড় বয়ে যায় দর্শক মনে। ছবি সুপার-ডুপার হিট! নায়ক হিসেবে পায়ের নিচে মাটি পেয়ে যান রাজেশ খান্না। ‘আরাধনা’ ছবিতে তিনি যেমন ব্যক্তিত্ববান প্রেমিক, তেমনি ‘আন্দাজ’-এ তাকে দেখা যায় দুরন্ত প্রেমিকের ভূমিকায় হেমামালিনীর সঙ্গে। পর্দায় রাজেশের ‘জিন্দেগী এক সফর হ্যায় সুহানা’ গানটিই তার প্রমাণ।

এরপর ক্রমেই চলে আসে বধির এক সময়। ভালোবাসার পূন্যাত্মক সংস্কারগুলো সময়ের খোলা হাওয়ায় সিনেমা থেকে বিতাড়িত হতে শুরু করে। মুখে মুখে ফিরতে তাকে চটুল গান ‘হাম তুম এক কামরে মে বন্দ হো অর চাবি খো যায়ে’। নতুন কথার নতুন যুগের এই গানে দর্শক ভিন্ন স্বাদ পায়। তারা হলে বসে হাততালি দিয়ে সেই নতুনকে স্বাগত জানায়। কিন্তু তখনও দর্শকের কিছু পাওনা বাকি ছিল। সেটা পূরণ করে দেন অমিতাভ বচ্চন। ‘অভিমান’-এ এই নায়ক যখন নায়িকা জয়ার কাছে জানতে চান, শিক্ষক কোথায় মেরেছে? উত্তরে জয়া তার হাতের তালু সামনে বাড়িয়ে দিলে অমিতাভ সেখানে গভীর আবেগে চুমু এঁকে দেন। এই দৃশ্য দেখে দর্শক নড়েচড়ে বসেন। সমালোচকরা প্রায়ই বলেন, অ্যাকশন সিনেমা রোমান্টিক নায়কদের হত্যা করেছে। এর বড় প্রমাণ সম্ভবত অমিতাভ বচ্চন স্বয়ং। ‘দিওয়ার’-এর অমিতাভ ‘সিলসিলা’র অমিতাভকে হত্যা করেছে। যদিও হারানো সময়ের জনপ্রিয়তা ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই অমিতাভ বচ্চন নিজের ইমেজ তৈরি করে নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু ততদিনে সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে। প্রেম চলে এসেছে প্রকাশ্যে। নায়ক কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই সরাসরি ঢুকে পড়ছে নায়িকার বেডরুমে। আর বেডসিন তো এখনকার হিন্দি সিনেমায় ডালভাত। রোমান্টিক দৃশ্যগুলোতে স্বল্পবসনা নায়িকাদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যে সেখানে আর যাই থাক প্রেম থাকছে না।
দর্শক এসব দেখে সিটি বাজাচ্ছে ঠিকই কিন্তু সিনেমাপ্রেমীদের তাতে মন ভরছে না। নইলে রাজেশ খান্নার পর একজন পরিপূর্ণ রোমান্টিক নায়ক পেতে শাহরুখ খান পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কেন? এই সময়ের মধ্যে যে প্রেমনির্ভর ভালো গল্পের ছবি হয়নি তা তো নয়। কিন্তু পার্থক্য পরিষ্কার-‘সঙ্গম’র রাজেন্দ্র কাপুরের সঙ্গে ‘ধাড়কান’র সুনীল শেঠীকে কিছুতেই মেলানো যায় না। একজন বিরহে কাতর হয়ে নিজেই নিজেকে গুলি করে। অন্যজন হয়ে ওঠে হিংস্র। দর্শক কোনটা মনে রেখেছে এতদিন পর তা অবশ্য কিছুটা অনুমান করে নেয়া যায়।

সালমান খানের ‘মেয়নে পেয়ার কিয়া’, আমির খানের ‘দিল’, ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ নির্ভেজাল প্রেমের ছবি। এই ছবিগুলো তরুণ দর্শকের যতটা ভালোবাসা পেয়েছিল এই সময়ের তরুণদের প্রেমের গল্পনির্ভর ছবি ‘সনম রে’, ‘এ জওয়ানি হে দিওয়ানি’, ‘ষ্টুডেন্ট অব দি ইয়ার’, ‘হাফ গার্লফেন্ড’, ‘ওকে জানু’-এ ধরনের ছবিগুলোর ক্ষেত্রে তেমন দর্শকপ্রিয়তার কথা ভাবাই যায় না। রণবীর সিং-দিপীকা পাড়ুকোন জুটি অল্পবয়সী দর্শকের হৃদয়ে কিছুদিন আসন পেলেও সব বয়সী দর্শকের কাছে দিলীপ কুমার-মধুবালা, রাজেশ খান্না-শর্মীলা ঠাকুরের পর শাহরুখ-কাজলই হলো সেরা রোমান্টিক জুটি। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’ ‘কাভি খুশি কাভি গম’ ও ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ এই ছবিগুলোই তার প্রমাণ। কাজলের ছলছল চোখের সেই ডায়লগ- ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায় রাহুল, তুম নেহি সমঝোগে’। এই দৃশ্যে সে সময়ের তরুণ দর্শক যেমন দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে, তেমনি বুড়োরা ফিরে গেছে ষাটের দশকের সেই সব দিনে।
আসলে কোনো কিছুই প্রেম ভালোবাসার সৌন্দর্যকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। একুশ শতকের শুরুতে হার্টথ্রব ঋত্বিক, সাইফ আলী খান, অক্ষয় কুমার, এমনকি সালমান খানকেও সেই চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছিল। সালমান খান নিজেকে বদলে ফেলে মাঝখানে অ্যাকশন-কমেডি, অ্যাকশন ঘরানার সিনেমা করে দর্শক মন জিতে নিয়েছেন। এই নায়কের ‘টিউব লাইট’ বক্স অফিসে ব্যর্থ হওয়ার এটি একটি কারণ। ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ সিনেমার এই নায়ক ‘প্রেম রতন ধন পায়ো’র মতো ফ্যামিলি বেজড রোমান্টিক সিনেমা করেও পরবর্তীতে সাড়া ফেলতে পারেননি। যে কারণে এ সময়ের হার্টথ্রব নায়ক রণবীর কাপুর, রণবীর সিং, টাইগার শ্রফদের জন্য রোমান্টিক সিনেমায় সফল হওয়ার চ্যালেঞ্জটা তাই থেকেই যাচ্ছে।

 

মতামত

comments

Post Author: admin