তাজমহল নিয়ে চলছে ষড়যন্ত্র

প্রেমের উপমা দিতে প্রেমিক যেমন ভুল করেন না তাজমহলকে কল্পনায় আনতে, তেমনি গল্প, কবিতা, উপন্যাসেও লেখকরা ভুলেন না তাজমহলের কথা টানতে। তাই তাজমহল নিয়ে লেখা খুঁজতে গেলে হয়তো সে তালিকা বেশ দীর্ঘ হবে।
ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির ভিনয় কাটিয়ার তাজমহলের নাম বদলে দেয়ার দাবি জানিয়ে বলেছেন, একজন হিন্দু শাসক তাজমহল তৈরি করেছেন। অনেক ডানপন্থী গোষ্ঠীও তার এই দাবি সমর্থন করছে। এই দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই। বরং ইতিহাসবিদদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, এমনকি ভারত সরকারও মনে করে যে এই সৌধ ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের এক চমৎকার নিদর্শন।
তাজমহল কে তৈরি করেছে?
ভারতের সরকারিভাবে সংরক্ষিত ইতিহাস অনুযায়ী, মোগল সম্রাট শাহজাহান তাজমহল তৈরি করেন তার মৃত স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মরণে।
ভারতের মোগল শাসকরা এসেছিল মধ্য এশিয়া থেকে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে তারা ভারত শাসন করে। মোগল শাসনামলে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। পুরো ভারতবর্ষজুড়ে ইসলামী শিল্পকলা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটে।
শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ব্যাপারে মোগলদের যে অনুরাগ, তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন বলে গণ্য করা হয় তাজমহলকে। ভারতের প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগ তাজমহলকে বর্ণনা করেছে ‘মোগল স্থাপত্যকলার চূড়ান্ত নিদর্শন’ হিসেবে।
তাজমহল নিয়ে ভারত সরকারের যে ওয়েবসাইট আছে, তাতে বলা হয়েছে যে ইসলামী স্থাপত্যকলার সঙ্গে ভারতের স্থানীয় স্থাপত্যকলার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা সেসময়ের স্থাপত্য রীতির সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহারণ এটি।
এতে আরো বলা হয়েছে, মোগলরা যখন তাজমহলের নির্মাণ কাজ শেষ করে, তখনো তারা তাদের পারস্য ও তুর্কী-মোঙ্গল শেকড় নিয়ে গর্ব অনুভব করে। কিন্তু ততদিনে তারা একইসঙ্গে নিজেদের ভারতীয় বলেও ভাবতে শুরু করেছে।
ইতিহাসবিদ রানা সাফভি বলেন, তাজমহলের ইতিহাস নতুন করে লেখার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। সেখানে যে কখনো কোনো মন্দির ছিল তার কোনো প্রমাণ নেই। তাজমহল তৈরি হওয়ার আগে সেখানে হিন্দু শাসক জয় সিংয়ের একটি ‘হাভেলি’(প্রাসাদোপম বাড়ি) ছিল।
তিনি বলেন, শাহজাহান এই হিন্দু শাসক জয় সিংয়ের কাছ থেকে হাভেলিটি কিনে নেন। এ নিয়ে একটি ‘ফরমান’ জারি করা হয়েছিল। সেটা এখনো আছে। এই ফরমানে দেখা যায় যে মোগলরা তাদের বিভিন্ন চুক্তি ও ইতিহাস রক্ষায় বেশ সচেতন ছিল।
এই ইতিহাসবিদ বলেন, ডব্লিউ ই বেগলি ও জেড এ ডেসাহাসের লেখা একটি বইতে এসব দলিল সংকলন করা আছে। এই বই পড়ে আমি উপলব্ধি করি যে এসব ভবন ও সৌধের ইতিহাস কত ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এই বই পড়েই আমি যুক্তি দিতে পারি যে তাজমহল তৈরি হয়েছে রাজা জয় সিংয়ের বাড়ির জমির ওপর এবং সেখানে কোনো ধর্মীয় ভবন থাকার কোনো উল্লেখ কোথাও নেই বলে দাবি করেন তিনি।
আরেকজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হারবনস মুখিয়া বলেন, শাহজাহান যে তার স্ত্রীর স্মরণে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ভারতের পাঠ্যবই এবং বিভিন্ন সরকারি সাইটেও তাজমহলকে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
মন্দির তত্ত্ব:- তাজমহলের ইতিহাস নতুন করে লেখার দাবি ভিনয় কাটিয়ারই যে প্রথম জানিয়েছেন তা নয়। এর আগে ডানপন্থী ইতিহাসবিদ পিএন ওক ১৯৮৯ সালে প্রকাশ করা ‘তাজমহল: দ্য ট্রু স্টোরি’ বইতে এই সৌধকে ‘তেজো মহল’ বলে দাবি করেন।
বইতে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে এটি ছিল আদতে একটি হিন্দু মন্দির এবং একজন রাজপুত শাসক এটি তৈরি করেন। সম্রাট শাহজাহান এটি দখল করে সেটিকে পরে তাজমহল নাম দিয়েছেন।
ওকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা লেখক সচ্চিনানন্দ শেভডে বলেন, সরকারের উচিত ‘প্রকৃত সত্য’ উন্মোচনের জন্য একটি দল নিয়োগ করা। তাজমহল কোনো মুসলিম স্থাপত্য নয়। এটি আসলে একটি হিন্দু স্থাপত্য।
স্থাপত্য রীতি:- মিস্টার কাটিয়ার ও মিস্টার শেভডে উভয়েই যুক্তি দিয়েছেন যে তাজমহলের স্থাপত্যে অনেক হিন্দু স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে।
তাদের মতে, তাজমহলের শীর্ষে একটি অর্ধাকৃতি চাঁদ আছে। ইসলামিক স্থাপত্যে এই চাঁদটি সাধারণত বাঁকা থাকে। কিন্তু তাজমহলের চাঁদ বাঁকা নয়। এই চাঁদ আসলে হিন্দু দেবতা শিবের সঙ্গে সম্পর্কিত। এছাড়া এই সৌধ চূড়ায় একটি কলসও আছে। সেখানে আমের পাতা ও উল্টে রাখা নারকেলও আছে। এগুলো হিন্দু প্রতীক। ইসলামী সংস্কৃতিতে ফুল, পশুর প্রতিকৃতি নিষিদ্ধ। কিন্তু তারপরও তাজমহলে এসব ব্যবহার করা হয়েছে।
মুখিয়া এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, স্থাপত্য রীতি সব সময় বদলায় এবং সেখানে বহু সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। মোগল স্থাপত্যকলাও এর ব্যতিক্রম নয়। কলস হিন্দু স্থাপত্যরীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু অনেক মোগল স্থাপত্যেও এটি দেখা যায়, তাজমহলেও। মোগলদের তৈরি আরো অনেক স্থাপত্যে কলস ও পাতা দেখা যাবে।
এখন কেন এই বিতর্ক:
বহু যুগ ধরে ভারতের পর্যটন বিভাগ সেদেশে পর্যটক টেনে আনার জন্য তাজমহলকে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে তুলে ধরছে। শাহজাহান ও মমতাজ মহলের প্রেম নিয়ে অনেক কবি-লেখক রচনা করেছেন অনেক কাহিনী।
ভারতে যখন হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে, তখন ভিনয় কার্টিয়ার এরকম একটা বিতর্কিত দাবি তুলেছেন। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দলটির রাজনীতিকরা ‘হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এ ধরনের বিতর্কিত দাবি একইসঙ্গে রাজনীতিকদের একটা সুযোগ করে দেয় কর্মসংস্থান বা অর্থনীতির অবস্থার মতো বাস্তব ইস্যু থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে।
সরকার এখনো তাজমহল বিষয়ক এই দাবিকে সমর্থন করেনি। কিন্তু ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলো এ নিয়ে সরব। এরকম একটি গোষ্ঠী এমন দাবি তুলেছে যে, তাজমহলে হিন্দুদের পুজা করতে দিতে হবে। বিবিসিতে প্রকাশিত খবরে এসব কথা বলা হয়েছে।#

মতামত

comments

Post Author: admin